Tuesday, January 14, 2014

বাংলাদেশি পণ্যের নতুন গন্তব্য তুরস্ক

বাংলাদেশি পণ্যের নতুন গন্তব্য তুরস্ক


গত বছর প্রায় পুরো সময় জুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা আর সহিংসতার মধ্যেও তুরস্কে পণ্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিস্ময়কর সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাজার না হলেও তুরস্কে পোশাক রপ্তানি ছিল ইর্ষণীয়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসম্বর) বাংলাদেশ থেকে তুরস্কে ৪৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি।
তুরস্কে রপ্তানি হওয়া বাংলাদেশের পণ্যের মধ্যে ৭৭ শতাংশই তৈরি পোশাক।
তুরস্ক নিজেরা পোশাক উৎপাদন থেকে সরে আসার পাশাপাশি নিজেদের ক্রমবর্ধমান বাজার বিদেশি পণ্যের জন্য নিজেদের বাজার উন্মুক্ত করে দেয়ায় বাংলাদেশের সামনে সুযোগ বেড়েছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা।
বেরসকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “গত এক দশক ধরেই তুরস্কের অর্থনীতি ব্যপকভাবে বাড়ছে। স্থানীয় বাজার ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়েছে। দেশটির নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা এই সুবিধা পুরোপুরি নিতে সক্ষম হয়েছেন।”
মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে একমত বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি এ কে এম সেলিম ওসমান।
তিনি বলেন, “গত কয়েক বছর ধরেই তুরস্কে আমাদের তৈরি পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। ইতিমধ্যে আমরা এর  ফল ভোগ করতে শুরু করেছি।
“কিছুদিন আগেও তারা নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশপাশি তৈরি পোশাক ইউরোপেও রপ্তানি করত। কিন্তু এখন তারা আর পোশাক উৎপদন করে না। সেই সুযোগেই আমরা তাদের বাজারে প্রবেশ করার সুযোগ পেয়েছি।”
তৈরি পোশাক উৎপাদন থেকে তুরস্কের সরে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে ব্যবসায়ী এই নেতা বলেন, “শ্রমের মূল্যসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে তাদের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। ফলে আমাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তারা টিকতে পারছিল না। এতে আমাদের দুই দিক দিয়ে লাভ হয়েছে- আমরা তাদের বাজারেও প্রবেশ করছি; আবার তারা ইউরোপে যে পোশাক রপ্তানি করত- সেটাও দখল করার সুযোগ এসেছে।”
“অনেক ক্ষেত্রে তুরস্কের ব্যবসায়ীরা আমাদের এখান থেকে পোশাক কিনে নিয়ে কারখানায় শুধু প্রিন্ট বা এমব্রয়ডারি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছেন।”
গত তিন-চার বছর ধরেই বিকেএমইএ নিট পোশাক রপ্তানির নতুন বাজার খুঁজতে জাপান, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রোডমার্চ, পণ্য প্রদর্শনীসহ (মেলা) নানা উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানান তিনি।
অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানি হওয়া ৭৭ শতাংশ তৈরি পোশাকের মধ্যে ৪০ শতাংশের বেশি নিট পোশাক।
একে দেশের অর্থনীতির জন্য ‘উল্লেখযোগ্য’ আখ্যায়িত করে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সার্বিক রপ্তানি যেখানে ১৬ শতাংশ বেড়েছে; সেখানে শুধু তুরস্কেই ৬০ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অবশ্যই একটা বড় উলম্ফন।”
তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হলে রপ্তানি আরও বাড়বে জানিয়ে এই গবেষক বলেন, “বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে তুরস্কে পণ্য রপ্তানিতে ১৭ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। এটা না লাগলে আমাদের রপ্তানি আরও বাড়বে।”
তিনি বলেন, “গত কয়েক বছরে তুরস্কে দ্রুত উন্নয়ন ঘটেছে। যার কারণে তাদের বাজারও বেড়েছে। তারা এখন তৈরি পোশাক বাদ দিয়ে অন্য সব খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। আমাদের এই সুযোগটিই কাজে লাগাতে হবে। আমাদের রপ্তানিকারকরা ইতিমধ্যেই সে কাজটি শুরু করে দিয়েছেন।।
সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দেন মোস্তাফিজুর রহমান।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি এক তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়, ২০১৩ সালে তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি এক বিলিয়ন (একশ কোটি) ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে।
এ সময়ে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। তুরস্ক থেকে বাংলাদেশ ১৯ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল।
এ হিসাবে বাংলাদেশের অনুকূলে উদ্বৃত্ত বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮০ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
তৈরি পোশাক ছাড়াও বাংলাদেশ থেকে পাটের সুতা (ইয়ার্ন) এবং সিরামিক তুরস্কে রপ্তানি হয়। অন্যদিক তুরস্ক থেকে বাংলাদেশ লোহা, স্টিল, মেশিনারিজ এবং ফেব্রিক্স আমদানি করে।
ইপিবির তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সালে বাংলাদেশ ৭৬ কাটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য তুরস্কে রপ্তানি করে। এর বিপরীতে আমদানি হয় ২১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের পণ্য। এসময় দুই দেশের মধ্যে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৯৮ কোটি ডলার।
ওই বছরে বাংলাদেশের অনুকূলে উদ্বৃত্ত বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৫৫ কোটি ২০ লাখ ডলার।
তুরস্ক সরকারের তথ্য মতে, ২০১২ সালের তুলনায় ২০১৩ সালে তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০০৯-১০ অর্থবছরে তুরস্কে ৪৭ কোটি ৮২ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ। ২০১০-১১ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ৭২ কোটি ৪৪ লাখ ডলারের পণ্য।
২০১১-১২ অর্থবছরে দেশটিতে রপ্তানির পরিমাণ কমে ৫৫ কোটি ১৯ লাখ ডলারে নেমে গেলেও ২০১২-১৩ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ৬৩ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের পণ্য।

Source: http://www.bdherald.com


তুরস্কে তৈরি পোশাকের রপ্তানী বেড়েছে ১০৭ শতাংশ

এক্সপোর্ট  প্রমোশন ব্যুরো  ইপিবি  জানিয়েছে,  তুরস্কে বাংলাদেশের তৈরি   পোশাকের  রপ্তানী  বেড়েছে  ১০৭শতাংশ।গত অর্থবছরের  জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যšত্ম  সময়ে তুরস্কে যেখানে রপ্তানীর পরিমাণ ছিল১৬২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সেখানে  চলতি  অর্থবছরের একই  সময়ে  এই রপ্তানির পরিমাণ বেড়েদাঁড়িয়েছে  ৩৩৫ মিলিয়ন  মার্কিন  ডলারে।
ইপিবি জানায়,  চলতি অর্থ  বছরের প্রথম ৬ মাসে তুরস্কে নিটওয়্যার  গার্মেন্টস  পণ্যের রপ্তানীর  পরিমান৯৬  মিলিয়ন মার্কিন ডলার  এবং ওভেন  গার্মেন্টস  পণ্যের পরিমাণ ২৩৯  মিলিয়ন মার্কিন  ডলার।

সূত্রমতে,  ২০১১-১২ অর্থ বছরে তুরস্কে  বাংলাদেশের  তৈরি  পোশাকের  রপ্তানীরপরিমাণ ছিল৩৫৬মিলিয়নডলার যা ২০১২-১৩  অর্থ  বছরে ১৭শ তাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে  ৩৫৬  মিলিয়ন  মার্কিন ডলারে।
তবে  তুরস্ক  সরকার২০১১-১২  অর্থ  বছরে বাংলাদেশের তৈরি  পোশাকের  উপর নিরাপত্তা  শুল্ক   আরোপ  করায় এই রপ্তানীর  পরিমাণ  কিছুটা  হ্রাস পেলেও ২০১৩ সালে  তুরস্ক  সরকার  এই শুল্কের ব্যাপারে  অনেকটা  ছাড়দেয়ায় আবার দেশটিতে বাড়তে  থাকে  বাংলাদেশের  তৈরি  পোশাক    রপ্তানীর  পরিমান।
বিজিএমইএর  সহসভাপতি  শহিদুল্লাহ  আজিম  বলেন, তুরস্কে বাংলাদেশের  তৈরি পোশাক  রপ্তানীর  ক্ষেত্রে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে  তাতে সরকারের  সহায়তা  যুক্ত  হলে  এই সম্ভাবনা  আরো       অনেক  দুর  এগিয়ে নেয়া সম্ভব  হবে।
ঢাকা ট্রিবিউন, আমাদের সময়.কম


Sunday, January 12, 2014

সবুজ পাহাড়ে মিনি গার্মেন্টস

সবুজ পাহাড়ে মিনি গার্মেন্টস




মহিলা অঙ্গন প্রতিবেদক
সবুজ পাহাড়ে মিনি গার্মেন্টস সৃষ্টিতে তাঁতের সাথে চলবে সেলাই মেশিন। চারদিকে পাহাড়। সবুজ আর সবুজ। আর এ সবুজ স্থানটি হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার মধুপুর চা-বাগান ঘেঁষা বনবিভাগের পুটিজুড়ি বনবিট এলাকায়। নাম কালিগজিয়া। এর ভেতরে আদিবাসীদের বসবাস। তাদের এ বসবাসের স্থানটিকে বলা হয় ত্রিপুরা পুঞ্জি। যুগ যুগ ধরে এ পুঞ্জিতে প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার বসবাস করে জীবিকা নির্বাহ করছে। পুঞ্জির অনেক পুরুষ নানা ফসলের চাষাবাদে জড়িত। নারীরাও বসে নেই। তারা তাঁত ও সেলাই মেশিন দিয়ে কেউ কেউ তৈরি করছে বাটিক শাড়ি আবার কেউ অন্য জামা-কাপড়। আদিবাসীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে তাঁতের পাশাপাশি ৫টি সেলাই মেশিন ও ৮০ হাজার টাকা ঋণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য কেয়া চৌধুরী। আদিবাসী নারীরা নিজস্ব পদ্ধতিতে নিরলসভাবে শ্রম দিয়ে তৈরি করে যাচ্ছে নানা ধরনের জামা ও শাড়ি। এসব জামা-কাপড় বিক্রিও হচ্ছে। একটু প্রশিক্ষণের প্রয়োজন, তাহলে তারা এখানে মিনি গার্মেন্টস সৃষ্টি করতে পারবে। বিষয়টি মাথায় আসে হবিগঞ্জ-সিলেট জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীর। তাই তিনি অনেক চেষ্টা করে যুব উন্নয়নের মাধ্যমে এ পুঞ্জিতে সেলাই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দেন। সরকারি বরাদ্দে ১৫ দিনব্যাপী পুঞ্জির নিকটবর্তী কালিগজিয়া স্কুলে পুঞ্জির আদিবাসী ২০ জন নারীকে নিয়ে সেলাই বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণে এসব নারীরা বলেন, ‘আমরা পাহাড়ে নানাভাবে বঞ্চিত ছিলাম।
এ প্রশিক্ষণ যেমন আমাদের সম্মানিত করেছে, তেমনি কর্মসংস্থানের পথ বের করে দিয়েছে। আমরা এ প্রশিক্ষণ নিয়ে এ পাহাড়েই মিনি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠা করব। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের মধ্যে সনদপত্র বিতরণ করেন কেয়া চৌধুরী। এ সময় তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণ দিয়ে আমার কাজ শেষ নয়, তাদের (আদিবাসী নারীদের) জন্য ঋণের ব্যবস্থা করে দেব।’ কেয়া চৌধুরী তাদের ২০ জনের মধ্য থেকে প্রথম পর্যায়ে শিল্পী রানী দেববর্মা, স্বপ্না রানী দেববর্মা, স্বপ্না দেববর্মা, মিনুকা দেব বর্মার প্রত্যেককে ২০ হাজার করে ৮০ হাজার টাকার চেক ও ৪টি সেলাই মেশিন ছাড়াও অপর এক আদিবাসী নারীকে একটি সেলাই মেশিন প্রদান করেন। এ ৫ নারীর মাধ্যমে অন্যরা কাজ করে এ পাহাড়ে গড়ে তুলবে মিনি গার্মেন্টস। সাংসদ কেয়া চৌধুরী তাদেরকে পরামর্শ দেন, এখানে নারী কল্যাণ সমিতি গঠন করার জন্য। এ সমিতির মাধ্যমে তাদের তৈরি হবে কর্মসংস্থান। তিনি বলেন ‘এখানের তৈরি কাপড় ব্যাপকভাবে বাজারজাত হলে যেমন করে আদিবাসীরা উপকৃত হবে, তেমনি দেশও এগিয়ে যাবে। এখানের তৈরি কাপড় যাবে বাইরের দেশেও। আদিবাসী নারীরা জানান, যুগ যুগ ধরে তারা এ পাহাড়ে বসবাস করে তাঁত দিয়ে নানা ধরনের জামা-কাপড় তৈরি করে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বাকি কাপড় বিক্রি করে দিচ্ছে। তাঁতগুলো পুরনো হয়ে গেলেও তারা এ পেশাকে ধরে রেখেছে। এখন এ শিল্পকে আরো এগিয়ে নেবে প্রাপ্ত ঋণের টাকা ও সেলাই মেশিনগুলো।

Related All Post: 

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বাজার এককভাবে দখল করে নিচ্ছে ভারত

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বাজার এককভাবে দখল করে নিচ্ছে ভারত


বাংলাদেশে দীর্ঘদিন থেকে চলছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। চীনের তৈরি পোশাকের উচ্চ মূল্য। এই দু’য়ের কারণে বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের বাজারে একক নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে ভারত। আর এ কথা খোদ ভারতের পোশাক রফতানিকারকরাই স্বীকার করেছেন। ভারতের নিজেদের হিসেবেই গত বছরের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতের তৈরি পোশাক রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩.৪ শতাংশ। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে ভারতের পোশাক রফতানি ছিল ১৫৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার। যা ছিল আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা আর চীনের তৈরি পোশাক উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে এ দেশ দুটি থেকে বিশ্ব বাজারের মনোযোগ সরে আসছে। আর এতে সুবিধা পাচ্ছেন ভারতীয় পোশাক রফতানিকারকরা। বাংলাদেশ ও চীনের বাজার থেকে গার্মেন্টের বড় বড় সব অর্ডার চলে যাচ্ছে ভারতে।
সম্প্রতি ইকোনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়। এতে আরও বলা হয়, এ পরিস্থিতিতে ভারতীয় পোশাক রফতানি সুবিধা পেতে যাচ্ছে। একটি সূত্র জানায়, গত বছরের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতের তৈরি পোশাক রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩.৪ শতাংশ। কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি (সিটি)-এর মহাসচিব ডি কে নায়ার ইকোনমিক টাইমসকে জানান, চলমান অর্থবছরে তৈরি পোশাক রফতানিতে উৎসাহব্যঞ্জক ক্রমবৃদ্ধি দেখা গেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প নিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, ‘দেশটির রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি নিরাপত্তা ইস্যুগুলো সেখানকার পোশাক শিল্পের জন্য গুরুতর সমস্যা হয়ে আবির্ভূত হয়েছে।’ বাংলাদেশের কিছু বিদেশী ক্রেতা এখন ভারত থেকে পোশাক ক্রয়ের আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে ভারতের পোশাক রফতানি ছিল ১৫৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার। যা ছিল আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। 
এদিকে দেশের গার্মেন্ট শিল্প খাতে নানাভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করে এই শিল্পকে পাটের অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে অভিজ্ঞমহল থেকে আশংকা প্রকাশ হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই গার্মেন্ট শিল্পের বিশৃঙ্খলা ও নানা ঘটনা প্রবাহে অস্থিরতা সৃষ্টি করে বিদেশী ক্রেতাদের বাংলাদেশের পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে একটি মহল থেকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সুযোগ সন্ধানী এই মহলটি বাংলাদেশ ও গার্মেন্ট বিষয়ে বিদেশী ক্রেতাদের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করছে। তারা একই সাথে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার খবরটি ফলাও করে বিশ্ববাসীর কাছে প্রকাশও করছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে গার্মেন্ট খাত নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করে আমাদের এই শিল্পকে পাটের অবস্থায় নিয়ে যাওয়ারও ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।
সূত্রমতে, একটি মহলের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই একটি সুসমন্বিত ব্যবস্থায় বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প নিয়ে বিদেশে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করছে। তারা সংবাদের পাশাপাশি ভবন ধ্বস ও অগ্নিকা-ের ঘটনার ভিডিও চিত্র ধারণ করে বিদেশী ক্রেতা ও সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের অবহিত করছে। এর মাধ্যমে এদেশের পোশাক শিল্প সর্ম্পকে বিদেশী ক্রেতারা আগ্রহ হারাচ্ছে। ঠিক এভাবেই এক সময় এদেশের চিংড়ী শিল্পকে নিয়েও ষড়যন্ত্র হয়েছে। পাট শিল্পকে এদেশ থেকে সরিয়ে দিতে স্বাধীনতা উত্তর সময়ে ঘন ঘন পাটের গুদামে আগুণ দেয়া হতো। পরে এই শিল্প এদেশে আর টিকতে পারেনি।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত দেশের তৈরি পোশাক শিল্প নিয়ে চলছে নানামুখী ষড়যন্ত্র। সাম্প্রতিক সময়ে সাভারের রানা প্লাজা ধসের পরে এখানেও এক নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে ভবন মালিক সরকারের দলীয় লোক হওয়া সত্ত্বেও খোদ প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে রানাকে দলীয় লোক নয় বলে মিথ্যাচার করা হয়েছে। তাই সংশয় দেখা দিয়েছে এই নির্মম ঘটনারও হয়তো কোন তদন্ত হবে না, অপরাধীরাও একদিন পার পেয়ে যাবে। দেশের চলমান অবস্থায় গার্মেন্ট সেক্টরের এই অস্থিরতার পেছনে ইন্ধন দেয়ার জন্য সরকার মালিক বা শ্রমিকদের পক্ষ থেকেও বরাবরই অস্বীকার করা হচ্ছে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে দেশের উদীয়মান এই শিল্পকে ধ্বংস করতে অস্থিরতা তৈরি করে প্রকৃত অর্থেই ফায়দা লুটছে কারা?
সচেতন মহল এটাও মনে করছেন বর্তমান গার্মেন্ট শিল্পের মতো এ ধরনের অনেক ষড়যন্ত্র আমাদের নিকট অতীতে পাট শিল্পকে নিয়েও হয়েছে। আর একারণেই বাংলাদেশ এখন পাটের কোন শিল্প নেই অথচ এই পাট শিল্পটি এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে আমাদেরই প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। সেখানে বাংলাদেশের পাটের মাধ্যমেই অনেক শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। অথচ পাট উৎপাদন করেও আমরা এই শিল্প ধরে রাখতে পারি নাই।
সূত্র জানায়, আমাদের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ২০ শতাংশ আয়ই সাভার, আশুলিয়া এবং কাঁচপুরের পাঁচ শতাধিক গার্মেন্ট কারাখানার উৎপাদিত পণ্য রফতানি করে অর্জিত হয়। আর টাকার অংকে এর পরিমাণ হবে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ। আর এ কারণেই পাশ্ববর্তী ভারতসহ আরো কয়েকটি দেশ আমাদের এই অঞ্চলের গার্মেন্ট শিল্পকে টার্গেট করেছে।

Tuesday, January 7, 2014

‘সস্তায় শ্রম নয়, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দরকার দক্ষ শ্রমশক্তি’

‘সস্তায় শ্রম নয়, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দরকার দক্ষ শ্রমশক্তি’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, সস্তা শ্রম শুরু থেকে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের চালিকা শ্রক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তবে প্রবৃদ্ধি গতিধারা বজায় রাখতে হলে এখন আর শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। দরকার দক্ষ শ্রমশক্তি। এর প্রতিফলন না ঘটলে এই শিল্প বেশি দিন এগুতে পারবে না।
শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে পোশাক শিল্পে চ্যালেঞ্জ এবং উত্তরণের উপায় শীর্ষক জাতীয় সংলাপে তিনি এ কথা বলেন।
গবেষণা সংগঠন চিন্তার চাষ ও দি ঢাকা ফোরাম সংলাপটির যৌথ আয়োজন করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সংলাপে উপস্থিত ছিলেন, ঢাকা বিশ্বব্যিালয়ের অধ্যাপক কেএএম সা’দউদ্দিন, ড. এআই মাহবুব উদ্দীন আহমেদ, বিজিএমইএ সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী, বিকেএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বিকেএমইএ সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, চিন্তার চাষের চেয়ারম্যান মুহাম্মাদ শফিকুর রহমান, গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি’র সভাপতি তাসলিমা আক্তার লিমা, শ্রমিক নেতা বাহরানে সুলতান বাহার প্রমুখ।
সংলাপে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, গভীর গবেষণা, মালিক শ্রমিক দূরত্ব, কার্যকরি ট্রেড ইউনিয়ন ও অবকাঠামোগত সমস্যা পোশাক শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ থেকে উত্তরণ ও শিল্পকে এগিয়ে নিতে শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠন ও সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দেন বক্তারা।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন, অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর পরিচালক ও ঢাকা বিশ্বব্যিালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকউজ্জামান।
বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, পোশাক শিল্পকে বাচাতে হলে মালিক শ্রমিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আর এই শিল্পের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গবেষণা দরকার; যা করতে বিজিএমইএকে দায়িত্ব নিতে হবে।
বিআইডিএস এর গবেসণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন বলেন, বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে যারা ঢাকার বাইরে কারখানা করবে তাদের জন্য অবকাঠামোগত সুবিধা দিতে হবে। যার পুরো দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।
 তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহবুব জামিল বলেন, রাজনৈতিকভাবে এখন ট্রেড ইউনিয়ন ব্যবহার হচ্ছে। এ থেকে বেরিয়ে আসলে ট্রেড ইউনিয়ন আরও ভূমিকা রাখতে পারতো। আবার সরকারের অনেক কিছু করার থাকলেও তা করছে না।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম.এম আকাশ বলেন, সরকারের দায়িত্বটা কতটুকু কার্যকরি হবে তা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে। শ্রমিকদের অধিকার, নিয়মিত মজুরি কিংবা সঠিক ক্ষতিপূরণ দিতে পারছি না আমরা। তোবার শ্রমিকদের বেতন নিয়ে এমন হতো না। যদি এর জন্য কোনো কল্যাণ তহবিল থাকতো।
সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পোশাক খাতে মালিক শ্রমিক উন্নতি যতটুকু হয়েছে ততটুকু সামাজিকভাবে উন্নতি হয়নি। শ্রমিকদের অতিরিক্ত কাজ ও উৎপাদনশীলতা একরকম নয়। তাদের চাপ দিয়ে ওভারটাইমের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে করা হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, সস্তা শ্রমিকই পোশাক শিল্পের গড়ে ওঠার অন্যতম কারণ ছিল। তবে স্বল্প মজুরি যা চলতি বাজারে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট না হলেও শ্রমিকরা দলে দলে যোগ দিয়েছে এবং এই শিল্পকে এগিয়ে নিয়েছে।
তবে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, তার উপর অনিয়মিত বেতন ভাতা এবং কাজের সুষ্ঠু পরিবেশের অভাবের কারণে শ্রমিক অসন্তোষ বাড়ছে।এর চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপত্তাহীনতা।একের পর এক অগ্নিকাণ্ড প্রাণহানির ঘটনায় শ্রমিকরা নিরাপত্তা নিয়েই বেশি আতঙ্কিত।
বলা হয়, বিল্ডিং কোড মেনে কারখানা তৈরি করে পোশাক শিল্প শুরু হয়নি। বরং পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে মালিকরা তড়িঘড়ি করে আবাসিক বাসাবাড়িতে কারখানা স্থাপন করেছে। এটা শুধু পোশাক শিল্পের জন্য ক্ষতি নয় বরং মালিক-শ্রমিক তথা গোটা অর্থনীতির জন্যও ক্ষতি।
শ্রমিককের মজুরি বৃদ্ধির কথা উঠলেই বাজার হারানোর প্রশ্ন আসে।যখন বেতন ৬০০ টাকা ছিল তখনও একই প্রশ্ন বারবার এসেছে। যিনি কম দামে মান সম্পন্ন পণ্য বাজারে ছাড়তে পারবেন তিনিই টিকে থাকবেন।এর জন্য প্রয়োজনীয় উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি।তার জন্য প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ শ্রমিক।কিন্তু শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধির কোনো উদ্যোগ নাই।
শিল্পের চ্যালেঞ্জ নিয়ে বলা হয়,তিন দশকের বেশি সময় পার হওয়ার পরও আমাদের পোশাক শিল্প এখনও এ টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। এত দীর্ঘ সময়েও যদি এই শিল্প টিকে থাকার সংগ্রাম করতে হয় তাহলে এখনও উদ্যোক্তারা উদ্যোক্তার বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারেনি।এখনও নিজস্ব ব্রান্ডের কোনো পণ্য বিশ্ববাজারে পরিচিত করাতে পারেনি। তাই আমাদেরকেও কৌশল পাল্টাতে হবে। শুধু সস্তা শ্রমমূল্যের উপর নির্ভর না করে উৎপাদনশীলতা এবং গুনগত মান বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে, সেই সঙ্গে প্রয়োজন পণ্যের বৈচিত্রকরণ এবং বাজারের সম্প্রসারণ।
শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্যের বৈচিত্রকরণ, উচ্চ মূল্যের পণ্য উৎপাদনের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধি ও কাজের পরিবেশ উন্নয়নের বিকল্প নাই।এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শ্রমিককের বেতন বৃদ্ধি এবং তার নিরাপত্তা ও জীবনের মান উন্নয়নের বিষয়টিও অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।